গল্প

কলেজের প্রথম দিনটি আলসেমি কিংবা গল্প-গুজব করে কাটেনি কারও। ছিল না কারও মধ্যে কোন পরিচিত হওয়ার তাড়নাও। খুব সাদামাটা একটা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বরন করে নিল নতন কলেজটি। নবীন শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই জেলার নামকরা দুটি সরকারী বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। সুতরাং নতুন করে পরিচয়ের খুব বেশি প্রয়োজন তারা মনে করে নি। পরিচিত বন্ধরা একসাথে গোটা হলরুমের বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে এরা।
শহরের বাইরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে এই স্বনামধন্য কলেজটিতে। শহরের বড় বড় বিদ্যালয় থেকে আগত শিক্ষার্থীদের ভীড়ে কোথাও কোথাও আশ্রয় নিয়ে ফেলেছে এরাও। মনি এদেরই একজন। অজপাড়া গাঁয়ের ছোট্ট একটা বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক পড়ার সুযোগ হয়েছিল ওর। এই বিশাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তাই ওর জন্য এক অজানা রাজ্য। চারিদিকে সব নতুন মুখ।

একটু লেকচার আর একটু বয়ানের পর্ব শেষ করে ঘন্টাখানেকের নবীন শিক্ষার্থীদেরকে কয়েকটি বিভাগে ভাগ করে পাঠিয়ে দেওয়া হল ক্লাস রুমে। মনির ভাগ্যে পড়ল যমুনা সেকসন।

শ’খানেক নতুন মুখ ওর চারপাশে। নতুন একজন শিক্ষক এসে লেকচার দিয়ে যাচ্ছে। পড়ালেখার প্রতি খুব বেশি মনোযাগ নেই ওর। হয়তো বাড়ির কথা মনে পড়ছে। আব্বু-আম্মু কিংবা ছোট ভাইয়ের কথা। অপরিচিত এই মানুষগুলো যে ওর সহপাঠি এগুলোও বিশ্বাস করতে পারছে না ছেলেটি। আশেপাশের দুই একজনের সাথে দুই একটা কথা বলেই ক্ষান্ত হয়ে পড়ল।

বিশাল ক্লাস রুমের অর্ধেকটা মেয়ে শিক্ষার্থীরা জুড়ে নিয়েছে। লাজুক মনি খুব বেশি একটা ওদের দিকে তাকাতে পারছে না। তবুও নতুন পরিবেশে চারিদিকে তাকিয়ে নেওয়াটা দায়িত্ব মনে করেই মনি একবার মেয়েদের সাঁড়ির দিকে তাকিয়ে নিল।

হটাৎ ওর চোখ আটকে গেল।  দু বেঞ্চ পরে বসে থাকা একটা মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এতগুলো অপরিচিত মুখের মধ্যে এই মেয়েটিকেই খুব চেনো মনে হল। মনির কল্পনা রাজ্যে হয়তো এতদিন ধরে এমন একটি স্ক্রেচ বানিয়ে রাখা ছিল। হয়তো রোজই চোখের সামনে এই অবয়বটি ভাসতো। আজ হটাৎ সেই স্ক্রেচটাকে বাস্তবে দেখে একটু থমকে গেল মনি।

খুব সাদামাটা একটা মেয়ে। কালো বোরকা আর মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে  একাকি বসে আছে। এত কলহলের মধ্যেও কি ভীষণ শান্ত এই মেয়েট। ওর চোখে চোখ পড়লেই রাজ্যের ক্লান্তি দুর হয়ে যায়। লাজুক মনি তাই তাই সেদিকে তাকিয়েই পরিতৃপ্তি পায়।

No comments