স্মৃতিতে বৃষ্টি ভেজা

এক সময় বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসতো কিংবা ঠান্ডা লাগতো। তাই আব্বু আম্মু কখনই বৃষ্টিতে ভিজতে দিত না। কিন্তু সেই বাঁধা আমার দুরন্ত মনকে কখনই থামিয়ে রাখতে পারেনি। কত যে বকা খেয়েছি এই একটা অপরাধের জন্য তার হয়তো সঠিক কোন হিসাব মিলবে না।
একটু বৃষ্টি হলেই ছুটে যেতাম দিগন্তের খোজে, দুরের খেলার মাঠ কিংবা কোন এক পুকুরে ঝাপিয়ে পড়তাম দস্যি ছেলেদের সাথে। জ্বর না বাধিয়ে কখনও বাড়ি ফেরার অভ্যাস আমার ছিল না। প্রায়সই আম্মু কিংবা আব্বু লাঠি হাতে হাজির হত। লাল চোখ নিয়ে আমি তখন ছুটে যেতাম বাড়ির দিকে
অথচ, এই সব গল্পগুলো আজ কত অচেনা! চার দেওয়াল ছিড়ে বের হওয়া ছোট্ট জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখি। চিরচেনা সেই বৃষ্টির ফোঁটা আগেকার দিনের মত আমাকে চঞ্চল করে তোলে না। দুরে কোথাও পালিয়ে যেতেও ইচ্ছা করে না। অনুভূতিগুলো সব ম্লান হতে বসেছে হয়তো।
এইসব নিত্যদিনের রুটিনের বাইরেও জীবনে অনেক কিছু ঘটে যায়। হারিয়ে ফেলা শৈশব হটাৎ এসে ধরা দেওয়া, ঠিক আজকের দিনটির মতো।
একটু বেশি অলস হওয়ার কারনে হয়তো পরীক্ষার আগের রাতটা আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই সাথে রাত জেগে থাকার নতুন অভ্যাস তো আছেই। গতরাতে তাই আর ঘুমানো হয়নি। ইচ্ছা ছিল পরীক্ষা দিয়ে এসেই রাজ্যের যত ঘুমের মধ্যে হারিয়ে যাব।
কিন্তু হটাৎ এক টুকরো বৃষ্টি এসে সেই ইচ্ছে গুলোকে নিমিষেই উড়িয়ে দিল। অবিরাম বৃষ্টির মাঝে হলের সিনিয়র জুনিয়র মিলে ছুটে গেলাম সেন্ট্রাল ফিল্ডে। এই চিত্র আমার কাছে ভিন্ন নয়। প্রায়ই তো এমনই হয়। তবুও আমার কাছে এর একটা আলাদা মূল্য আছে। ছেলেবেলার দুরন্ত সময়গুলোর সাথে এটাকে খুব সহজেই মিলিয়ে নেওয়া যায়। মূষল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে, আমরা মেতে আছি ফুটবল খেলায়। মাথার উপরে মেঘগুলো উড়াউড়ি করছে, আর বিশাল আকাশ অজানা কারনে ছুটি নিয়ে বসেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে যায়, আমাদের খেলা শেষ হয় না। কখনও এত বৃষ্টিতে ভিজিনি। ৭০০ একরের এই ক্যাম্পাসে গুটি-কয়েক বৃষ্টির ফোঁটাই হয়তো গায়ে লেগেছিল। অথচ আজ বৃষ্টির জলে একাকার হয়ে গেলাম। টানা চার ঘন্টা বৃষ্টিতে ভেজার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অথচ, আম্মু একবার খোজ নিতে আসলো না, আব্বু লাঠি হাতে আমাকে ধমক দিয়ে যায়নি।
ছেলেবেলার সেই চিরচারিত নীতি অনুযায়ী আজও জ্বর আসবে কিনা জানি না। তবে সেইসব গল্পের শেষ দৃশ্যপট কখন যে হটাৎ করেই অধরা হয়ে গেল বুঝতে পারিনি! মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে শুয়ে মেঘেদের আনাগোনা দেখছিলাম। সারা গায়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটায় একেকার। এই অনুভূতি গুলো কখনও পুরানো হবে না। তাইতো বারবার শেষ দৃশ্যপটের জন্য অধীর হয়ে পড়ছিলাম। অথচ কেউ এসে বকা দিয়ে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়নি। খেলা শেষে চোখ লাল করে একা একা গন্তব্যের দিকে ফিরে এসেছি। নিজের আয়োজনে ফ্রেস হয়েছি। লাল চোখের দিকে নজর দিয়ে কেউ বাড়িয়ে বাড়িয়ে কিছু বলেনি! দরদ মেশানো এইসব বকাবকি গুলো এখন আর আমার না। সময়ের স্রোতে অজস্র হারিয়ে যাওয়ার ভীড়ে ওরাও হারিয়ে গেছে কোথাও হয়তো। ছেলেবেলার গল্পগুলোর শেষ দৃশ্যের কথা ভেবে ভেবে কখনও লাল চোখের কোনে দু’ফোঁটা জল চলে আসে। তারপর আবার মুছে ফেলি।
জল আসুক, অঝোর ধাঁরায় গড়াতে থাকুক এই জল। মূষল ধারার বৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাক এই জল। আমি আবার এই জলে ভিজতে চাই। আবার দিগন্তের পথে হারিয়ে যেতে চাই, আবার বকা খেতে চাই।

No comments